চীনের ‘গোয়েন্দা’ বেলুন ধ্বংস করল যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিমান

৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৩ ০১:১১  

যুক্তরাষ্ট্রের আকাশে গোয়েন্দা বেলুন উড়তে দেখার পর প্রথমে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিংকেন তার নির্ধারিত চীন সফর স্থগিত করেন। এরপর স্থানীয় সময় শনিবার যুদ্ধবিমান ব্যবহার করে বেলুনটি ধ্বংস করা হয়। বেলুনটি ধ্বংসের অভিযান চালানোর সময় উত্তর ও দক্ষিণ ক্যারোলাইনা অঙ্গরাজ্যে উপকূলের কাছে তিনটি বিমানবন্দর বন্ধ রাখা হয়েছিল।

পরে টুইটরে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে দেখা যায়, আকাশে ছোট একটি বিস্ফোরণের পর একটি বেলুন নিচের দিকে পড়ছে। বেলুনটির ধ্বংসাবশেষ আটলান্টিক মহাসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের জলসীমায় পড়েছে।

পেন্টাগনের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, গত বুধবারই বেলুনটি ধ্বংসের পরিকল্পনার অনুমোদন দিয়েছিলেন বাইডেন। তবে তিনি বলেছিলেন, এটা করতে গিয়ে যেন কোনো মার্কিন নাগরিকের জীবন ঝুঁকির মুখে না পড়ে। আর শনিবার বেলুনটি ধ্বংসের আগে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বাইডেন বলেছিলেন, ‘বিষয়টি তিনি সামলাবেন।’

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা কর্মকর্তারা এটিকে চীনের উচ্চতর ‘নজরদারি’ বেলুন হিসেবে আখ্যায়িত করলেও চীনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, এটি ‘আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ’ বেলুন। তবে যুক্তরাষ্ট্রের আকাশসীমায় অনিচ্ছাকৃত প্রবেশের জন্য এক বিবৃতিতে দুঃখপ্রকাশ করেছে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

বিবিসি এক প্রতিবেদনে জানায়, নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন জ্যেষ্ঠ প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা বলেছেন, হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে বেলুনটিকে গুলি করার নির্দেশ দিলে এফ-২২ যুদ্ধবিমান প্রস্তুত করা হয়েছিল। কিন্তু ওই দিনই প্রতিরক্ষা সচিব লয়েড অস্টিন এবং মার্কিন জয়েন্ট চিফ অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল মার্ক মিলিসহ শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তারা গোয়েন্দা বেলুনটির হুমকি মূল্যায়ন করতে জরুরি বৈঠক করেন এবং সিদ্ধান্ত নেন, গুলি করা হলে বেলুনটির ধ্বংসাবশেষ মানুষের জন্য বিপদ ঘটাতে পারে। তাই তারা গুলি না করার পরামর্শ দেন। তবে পরে এই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে পেন্টাগন।

অপরদিকে চীন দাবি করেছে যে, বেলুনটি তাদের একটি বেসামরিক আবহাওয়া পর্যবেক্ষক, যা তার নির্ধারিত পথ থেকে সরে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের আকাশে যাওয়ায় তারা দুঃখপ্রকাশ করেছে।

কিন্তু বেলুনটি যুক্তরাষ্ট্রে গেলো কীভাবে প্রশ্নর উত্তরে বিবিসি ওয়েদারের সিমন কিং বলছেন, চীন এবং উত্তর আমেরিকার মাঝে নর্থ প্যাসিফিকে যে বাতাস বয়ে থাকে, তাকে বলা হয় ওয়েস্টারলিস। এটা সাধারণত পশ্চিমে তৈরি হয়ে পূর্ব দিকে বয়ে যায়। গত কয়েকদিনে ৩০ হাজার থেকে ৪০ হাজার ফিট উচ্চতায় বাতাসের গতিবেগ হতে পারে ঘণ্টায় ১৫০ মাইল (২৪০ কিলোমিটার) বা তার চেয়ে বেশি। ওই উচ্চতায় বাতাসের এরকম গতিবেগ অস্বাভাবিক কিছু নয়। গত কয়েকদিন ধরে সেখানে বাতাসের যে গতিবেগ রয়েছে, তাতে বেলুনটিকে আলাস্কার উপর দিয়ে উড়িয়ে নিয়ে গিয়ে কানাডা হয়ে মন্টানায় নিয়ে যাওয়া সম্ভব।

https://twitter.com/i/status/1621957862988677120

বলা হচ্ছে, মন্টানার বিলিংস শহরের আকাশে দেখা যাওয়ার আগে এটি আলাস্কার অ্যালেউটিয়ান দ্বীপপুঞ্জ এবং কানাডার মধ্য দিয়ে উড়ে এসেছে। এ ধরনের বেলুন সাধারণ হিলিয়াম গ্যাসে ভরা বেলুন হয়ে থাকে। এটি আকাশের অনেক উঁচুতে উড়তে সক্ষম হয়।বেলুনের নীচের অংশে একটি সৌরশক্তির প্যানেল থাকে, যা থেকে বেলুনটি পরিচালনার শক্তি যোগানো হয়।

এখন প্রশ্ন উঠেছে, স্যাটেলাইট যুগে এসেও নজরদারির জন্য কেন সনাতনী যন্ত্র বেলুন ব্যবহার করছে বেইজিং? এর উত্তর হিসেবে বিশ্লেষকরা বলছেন, বিশ্বে নজরদারি প্রযুক্তির সরঞ্জাম হিসেবে বেলুনের ব্যবহার অনেক পুরনো। তাছাড়া বেলুনকে স্পাই ক্যামেরা ও রাডার সেন্সরের মতো আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে কাজে লাগানো যেতে পারে এবং নজরদারির জন্য বেলুন ব্যবহারের কিছু সুবিধা রয়েছে; যার একটি হলো- এটি ড্রোন বা স্যাটেলাইটের তুলনায় কম ব্যয়বহুল আর কাজে লাগানোও সহজ।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রে আগ্নেয় বোমা ফেলতে এর ব্যবহার করেছিল জাপান। এছাড়া স্নায়ুযুদ্ধের সময়গুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন বেলুনের ব্যাপক ব্যবহার করেছিল। স্বাধীন আকাশ প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক হি ইউয়ান মিং বিবিসিকে বলেন, বেইজিং সম্ভবত ওয়াশিংটনকে সংকেত দেওয়ার চেষ্টা করছে।

“আমরা যেমন সম্পর্ক উন্নত করতে চাই, তেমনি প্রয়োজনীয় যে কোনো উপায়ে টেকসই প্রতিযোগিতার জন্যও প্রস্তুত, তবে তা তীব্র উত্তেজনা সৃষ্টি না করে। আর এর জন্য আপাতদৃষ্টিতে ‘নিরীহ’ বেলুনের চেয়ে ভালো হাতিয়ার আর কী হতে পারে?”

সিঙ্গাপুরের এস রাজারত্নম স্কুল অফ ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের চীনা প্রোগ্রামের কো-অর্ডিনেটর ড. হো বলেন, “আমেরিকান অবকাঠামোতে গোয়েন্দা নজরদারি কিংবা যে তথ্য পেতে চাইছে, সেটির অন্য উপায় রয়েছে তাদের। বেলুনটি পাঠানোর উদ্দেশ্য আমেরিকানদের কাছে একটি সংকেত পাঠানো এবং তারা কেমন প্রতিক্রিয়া দেখায় সেটি পরখ করা।”

কার্নেগি কাউন্সিল ফর এথিক্স ইন ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্সের আর্থার হল্যান্ড মিশেল বলেন, চীন হয়ত বেলুনটি ব্যবহার করে দেখাতে পারে যে, তাদের একটি অত্যাধুনিক প্রযুক্তি সক্ষমতা রয়েছে; যা উভয়ের মধ্যে গুরুতর উত্তেজনার ঝুঁকি ছাড়াই যুক্তরাষ্ট্রের আকাশে প্রবেশ করতে পারে। আর সেটি দেখানোর জন্য বেলুন একটি সেরা পছন্দ হতে পারে।